খনার বচন বাংলা সাহিত্যের আদি কীর্তির মধ্যে পড়ে। তাঁর বচন সাহিত্যের মস্ত ভাগ জুড়ে চাষাবাদের তত্ত্বকথা।*…………………
*ছোটোবেলা ঠাকুমা/ দিদিমার কাছে কিছু শুনেছি, কিছু মনে আছে বেশিরভাগ ভুলে গেছি। আজকালকার বাচ্চারা হয়তো জানেই না*
জ্যোতিষশাস্ত্রে গভীরজ্ঞানী তো ছিলেনই, অধিকন্তু আবহাওয়াদর্শন ও কৃষিবিদ্যারও নানা রহস্য মোচন হত তাঁর বচনে বচনে। এই আধুনিক যুগেও তার অনেক সত্যই সত্য থেকে গেছে। তেমন কিছু চালু নমুনা তুলে দিচ্ছি৷
*আবহাওয়াদর্শন ও কৃষিবিদ্যা সংক্রান্তঃ*
১) “যদি বর্ষে মাঘের শেষ ধন্যি রাজা পুণ্যি দেশ।”
২) “ব্যাঙ ডাকে ঘন ঘন শীঘ্র হবে বৃষ্টি জানো।”
৩) “গাছে গাছে আগুন জ্বলে বৃষ্টি হবে খনায় বলে।”
৪) “যদি হয় চৈতে বৃষ্টি তবে হবে ধানের সৃষ্টি।”
৫) “সাত হাতে তিন বিঘাতে কলা লাগাবে মায়ে পুতে।
৬) কলা লাগিয়ে না কাটবে পাত, তাতেই কাপড় তাতেই ভাত।”
৭) “গাছগাছালি ঘন রোবে না গাছ হবে তার ফল হবে না।”
৮) “খেত আর পুত যত্ন বিনে যমদূত।”
৯) পূর্ণিমা অমাবস্যায় যে ধরে হাল তার দুঃখ হয় চিরকাল।
১০) থেকে বলদ না বয় হাল, তার দুঃখ সর্বকাল।
১১) বাড়ির কাছে ধান গা, যার মার আছে ছা
১২) চিনিস বা না চিনিস, খুঁজে দেখে গরু কিনিস।
১৩) কোল পাতলা ডাগর গুছি লক্ষ্মী বলেন ঐখানে আছি।
১৪) শীষ দেখে বিশ দিন কাটতে মাড়তে দশ দিন।
১৫) বাপ বেটাই চাই তদ অভাবে ছোট ভাই।
১৬) সরিষা বনে কলাই মুগ, বুনে বেড়াও চাপড়ে বুক।
১৭) দিনে রোদ রাতে জল দিন দিন বাড়ে ধানের বল।
১৮) আউশের ভুঁই বেলে, পাটের ভুঁই আঁটালে।
১৯) এক অঘ্রাণে ধান, তিন শ্রাবণে পান।
২০) নদীর ধারে পুতলে কচু, কচু হয় তিন হাত উঁচু।
২১) ওরে ও চাষার পো শরতের শেষে সরিষা রো।
২২) না হয় অঘ্রাণে বৃষ্টি, হয় না কাঁঠালের সৃষ্টি।
২৩) দাতার নারিকেল বখিলের বাঁশ, না বাড়ে কমে বারোমাস।
চাল ভরা কুমড়াপাতা, লক্ষ্মী বলেন আমি তথা।
২৪) নারিকেল গাছে লুন-মাটি, শীঘ্র শীঘ্র বাঁধে গুঁটি।
২৫) মাছের জলে লাউ বাড়ে, ধেনো জমিতে ঝাল বাড়ে।
*মহামারী সম্পর্কেঃ*
২৬) “দাবানল, শস্যহানি, ঝড়, মহামারী
একত্রে ঘটিলে জেনো রাজা দুরাচারী ।।
২৭) রাজা যদি পাপমতি প্রবঞ্চক হয়।
রাজপাপে দেশময় বহে মৃত্যুভয়।।
২৮) অধর্ম কুকর্ম যদি কভু রাজা করে।
দেখিবে অন্নাভাবে প্রজাগণ মরে।।
*দৈনন্দিন জীবনে চলার সম্পর্কেঃ*
২৯) “মঙ্গলে উষা বুধে পা / যথা ইচ্ছা তথা যা”
৩০) “সূর্যের চেয়ে বালি গরম! নদীর চেয়ে প্যাক ঠান্ডা!”
অথবা “সমানে সমানে কুস্তি, সমানে সমানে দোস্তি”
৩১) “যা-ই করিবে বান্দা তা-ই পাইবে
সুঁই চুরি করিলে কুড়াল হারাইবে”।
*কন্যার রূপ লক্ষণঃ*
৩২) শ্যামাংগী সুকেশী তনু লোমরাজি কান্তা।
সুভুরু সুশীলা কিম্বা সুগতি সুদন্তা\
মধ্য ক্ষীণা যদি হয় পঙ্কজ নয়নী।
কুলহীনা হইলেও বরেষ্ট দায়িনী\
কুদন্তা অথবা হয় অধিক ব্যাপিকা।
পিঙ্গল লোচনা অঙ্গ ষষ্ঠী সলোমিকা\
মধুগুষ্টা যদি হয় রাজার বালিকা।
কুলে শ্রেষ্ঠা হইলেও অরিষ্ট দায়িকা\
*বাড়ি তৈরি ও খাদ্য অখাদ্য বিচারঃ*
৩৩) দক্ষিণ দুয়ারী ঘরের রাজা,
পুব দুয়ারী তাহার প্রজা
পশ্চিম দুয়ারীর মুখে ছাই,
উত্তর দুয়ারীর খাজনা নাই।
(অর্থ – স্বাস্থ্যের দিক দিয়ে দক্ষিণ দুয়ারী ঘর সবচে বেশী ভালো তারপর হচ্ছে পুব দুয়ারী ঘর। পশ্চিম দুয়ারী এবং উত্তর দুয়ারী ঘর ভালো না।)
৩৪) নিম নিসিন্দা যথা,
মানুষ কি মরে তথা।
(অর্থ – নিম নিসিন্দা গাছ বাড়ীর জন্য অত্যন্ত ভালো।)
৩৫) বক বকুল চাপা, তিন পুতোনা বাপা।
(অর্থ – বক বকুল চাপা এই তিনটি গাছ একত্রে বুনতে নেই।)
৩৬) উনা ভাতে দুনা বল, অতি ভাতে রসাতল।
(অর্থ – অতিরিক্ত খাদ্য গ্রহন স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর।)
৩৭) অধিক খেতে করে আশ, এর নাম বুদ্ধি নাশ।
(অর্থ – মাত্রারিক্ত খেলে বুদ্ধিনাশ ঘটে।)
৩৮) আঁতে তিতা দাঁতে নুন, উদর ভরো তিন কোন।
(অর্থ – পাকস্থলির চার ভাগের এক ভাগ খালি রেখে খেতে হয়।)
৩৯) বারো মাসে বারো ফল, না খেলে যায় রসাতল।
(অর্থ – সব মৌসুমেই কিছু কিছু মৌসুমি ফল খেতে হয়।)
৪০) জল খেয়ে ফল খায়, যম বলে আয় আয়।
(অর্থ – জল খেয়ে ফল খেতে নেই।)
৪১) বেল খেয়ে খায় জল, জির (কৃমি) যায় রসাতল।
(অর্থ – বেল খেয়ে জল পান করলে কৃমি নাশ হয়।)
৪২) খালি পেটে কুল, ভরা পেটে মূল।
(অর্থ – কুল খালি পেটে আর মূলা ভরা পেটে খাওয়া ভালো।)
৪৩) খেতে বসলে কিসের দায়, পাকনা ধান কি জলে যায়।
(অর্থ – নিশ্চিন্ত মনে আহার করা উচিত।)
৪৪) খানা খায় করে শব্দ, অলক্ষী খুশী লক্ষী জব্দ।
(অর্থ – নীরবে খাদ্যগ্রহন করতে হয়।)
৪৫) তপ্ত অম্ল ঠান্ডা দুধ,
যে খায় সে নির্বুধ।
(অর্থ – ঠান্ডা দুধ স্বাস্থ্যে জন্য ক্ষতিকর।—এখানে অম্ল বলতে টক্ খাদ্য বোঝানো হয়েছে)
৪৬) খেয়ে উদাইম্যা ভাত, শইল করে উৎপাত।
(অর্থ – শারীরিক পরিশ্রম না করলে খাদ্য হজম হয় না।)
৪৭) দুগ্ধ শ্রম গাংগা বারি, এ তিন উপকারী।
(অর্থ – দুধ, শারীরিক শ্রম এবং স্রোতস্বিনী নদী স্বাস্থ্যের জন্য ভালো।)
৪৮) ভোরের হাওয়া লাখ টাকার দাওয়া।
(অর্থ – লাখ টাকার ঔষুধের চাইতে ভোরের হাওয়া উপকারী।)
৪৯) শাক অম্বল পান্তা, তিনো অসুখের হন্তা।
(অর্থ – অসুখ হলে শাক অম্বল এবং পান্তা খেতে নেই।)
৫০) ঘোল কুল কলা, তিনে নাশ গলা।
(অর্থ – গলার অসুখ হলে ঘোল কুল ও কলা খেতে নেই।)
৫১) মাংসে মাংস বৃদ্ধি, ঘৃতে বৃদ্ধি বল
দুগ্ধে বীর্য বৃদ্ধি, শাকে বৃদ্ধি মল।
(অর্থ – মাংস খেলে মাংস বাড়ে, ঘিয়ে শক্তি বাড়ে, দুধে বীর্য বাড়ে এবং শাক খেলে মল বৃদ্ধি হয়।)
৫২) তেল তামাকে পিত্ত নাশ,
যদি হয় তা বারো মাস।
(অর্থ – সারা বছর তৈলাক্ত খাবার এবং তামাক সেবন করলে পিত্তের প্রভূত ক্ষতিসাধন হয়।)
৫৩) আহারান্তে চোখে জল,
দৃষ্টি শক্তির বাড়ে বল।
(অর্থ – খাবার পর চোখে জল ছিটানো চোখের জন্য ভালো।)
৫৪) সকালে সোনা, বিকালে লোনা।
(অর্থ – সকালের স্নান উত্তম আর বিকেলে স্নান করলে ত্বক মলিন হয়ে যায়।)
৫৫) প্রভাত কালে উঠে যে খাবে ঠান্ডা জল,
তাহার ঘরে বদ্যি না যাবে কোন কাল।
(অর্থ – সকালে ঘুম থেকে উঠে ঠান্ডা জল পান করতে হয়।)
মানবমন ও সমাজের গতিবিধি নিয়ে তাঁর পর্যবেক্ষণঃ
৫৬) “তেলা মাথায় ঢালো তেল,
শুকনো মাথায় ভাঙো বেল।”
৫৭) “ভাই বড় ধন, রক্তের বাঁধন
যদিও পৃথক হয়, নারীর কারণ।”
৫৮) “মেয়ে নষ্ট ঘাটে, ছেলে নষ্ট হাটে।”














Comments »
No comments yet.
RSS feed for comments on this post. TrackBack URL
Leave a comment