Read the interesting comments by our eminent historians Jadunath Sarkar and Ramesh Chandra Majumdar. – Partha Sircar

সম্রাট শাহজাহান: প্রেম, সাম্রাজ্য ও ইতিহাসের আয়নায় এক জীবন্ত কিংবদন্তি
—————————————————————————–
– শান্তনু সরস্বতী
ইতিহাসে কিছু নাম থাকে, যেগুলোকে সময় ধুলোয় ঢেকে দিতে পারে না। তারা যত পুরোনো হয়, ততই নবীন হয়ে ওঠে। সম্রাট শাহজাহান সেইরকমই এক নাম—যিনি একইসঙ্গে ছিলেন প্রেমিক, শাসক, যোদ্ধা, স্থপতি, এবং এক নিঃশব্দ দার্শনিক। তাঁর জীবন যেন এক অনন্ত কাব্য—যার প্রথম অক্ষর লেখা হয়েছিল প্রেমে, এবং শেষ চিহ্ন আঁকা হয়েছিল বন্দিদশায়।
১৫৯২ সালের ৫ জানুয়ারি, লাহোরের রাজপ্রাসাদে জন্ম নেন খুররম—পরে যিনি ‘শাহজাহান’ নামে পরিচিত হন। তাঁর পিতা ছিলেন সম্রাট জাহাঙ্গীর এবং মাতা রাজপুত রাজকন্যা জগৎ গোসাই। মুঘল রাজবংশে তখনও রাজনীতি, ষড়যন্ত্র আর প্রেমের মধ্যে সূক্ষ্ম এক টানাপোড়েন চলছিল। ছোটবেলা থেকেই খুররম ছিলেন অনন্য প্রতিভাধর—বুদ্ধি, যুদ্ধকৌশল ও নন্দনতত্ত্বে ছিল তাঁর সহজাত পারদর্শিতা।
ইতিহাসবিদ রমেশচন্দ্র মজুমদার তাঁর The History and Culture of the Indian People গ্রন্থে লিখেছিলেন— “Shah Jahan combined in him the political acumen of Akbar and the aesthetic refinement of Jahangir.” অর্থাৎ, শাহজাহানের মধ্যে আকবরের প্রশাসনিক মেধা এবং জাহাঙ্গীরের শিল্পবোধ—দুয়ের এক সুরেলা মিশ্রণ দেখা যায়। যুবরাজ খুররম ছোট থেকেই সামরিক নেতৃত্বে দীক্ষিত হন। ১৬০৭ সালে রাজপুত বিদ্রোহ দমন করে তিনি ‘শাহজাহান’ উপাধি পান, অর্থাৎ “জগতের অধিপতি।”
খুররমের জীবনের মোড় ঘুরেছিল রাজপ্রাসাদের এক ঝলমলে বিকেলে। সোনালী আলোয় ঝলসানো সেই অনুষ্ঠানে তাঁর দেখা হয়েছিল আরজুমান্দ বানু বেগমের সঙ্গে—যিনি পরে মুমতাজ মহল নামে ইতিহাসে অমর হন। তখন দুজনেরই বয়স মাত্র পনেরো। এক মুহূর্তের দৃষ্টিবিনিময়ই যেন ইতিহাসের গতিপথ পাল্টে দেয়। প্রেমের সেই শুরুর গল্প আজও তাজমহলের প্রতিটি মার্বেল পাথরে খোদাই হয়ে আছে। ১৬১২ সালে তাঁদের বিয়ে হয়—আর সেই বিয়ের সঙ্গে জন্ম নেয় পৃথিবীর অন্যতম অমর প্রেমকাহিনি।
যদুনাথ সরকার, তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ Fall of the Mughal Empire-এ লিখেছিলেন— “The relation between Shah Jahan and Mumtaz was not merely conjugal—it was spiritual companionship.” অর্থাৎ, মুমতাজ কেবল সম্রাটের স্ত্রী ছিলেন না, তিনি ছিলেন তাঁর আত্মার সাথি। মুমতাজের সঙ্গে শাহজাহানের সম্পর্ক ছিল মনের গভীর থেকে জন্ম নেওয়া এক বন্ধন। সাম্রাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তও তিনি স্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করতেন। ইতিহাস বলে, তাঁর মৃত্যুর পর শাহজাহান আর কখনও সেই শূন্যতা পূরণ করতে পারেননি।
১৬৩১ সালে বুরহানপুরে নবম সন্তানের জন্ম দিতে গিয়ে মুমতাজের মৃত্যু হয়। শোকাকুল শাহজাহান সেই মুহূর্তেই প্রতিজ্ঞা করেন—এই পৃথিবীতে এমন এক স্মৃতিসৌধ গড়ে তুলবেন, যা অমর প্রেমের প্রতীক হয়ে থাকবে যতদিন সূর্য ও চাঁদ আছে। সেই প্রতিজ্ঞার ফল তাজমহল—স্থাপত্যের ইতিহাসে এক অলৌকিক বিস্ময়। ২২ বছর ধরে ২০,০০০ শিল্পী ও কারিগরের হাতে গড়ে ওঠে এই সৌধ। মার্বেলের ওপর খোদাই করা প্রতিটি ফুল যেন মুমতাজের হাসির প্রতিধ্বনি, প্রতিটি মিনার যেন শাহজাহানের নিঃশব্দ শোকের প্রতীক। ইতিহাসবিদ রমেশচন্দ্র মজুমদার লিখেছিলেন— “The Taj is not only a monument of love; it is also a monument of the Mughal genius in architecture and planning.” তাজমহল কেবল প্রেম নয়—এটি মুঘল স্থাপত্যবোধের পরিণত রূপ, যেখানে ধর্ম, নন্দন ও হৃদয়ের সেতুবন্ধন ঘটেছে।
১৬২৭ সালে জাহাঙ্গীরের মৃত্যুর পর মুঘল সিংহাসন নিয়ে শুরু হয় রক্তক্ষয়ী লড়াই। নূরজাহান চেয়েছিলেন তাঁর জামাতা শাহরিয়ার হোক সম্রাট, কিন্তু দিল্লি ও আগ্রার সেনাপতি-অভিজাতরা সমর্থন দেন খুররমকে। ১৬২৮ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি, শাহজাহান দিল্লির ময়ূর সিংহাসনে বসেন। তাঁর শাসনকালেই মুঘল সাম্রাজ্য সর্বোচ্চ বিস্তৃতি পায়। আফগানিস্তান থেকে ডেকান পর্যন্ত—একটি সুবিশাল সাম্রাজ্য দাঁড়িয়ে যায় তাঁর শাসনে। দাক্ষিণাত্য, বুন্দেলখণ্ড, আফগান সীমান্ত—সব জায়গায় তিনি অভিযান চালান। ১৬৩২ সালে হুগলি অভিযানে পর্তুগিজদের পরাস্ত করে বাংলার স্বাধীন বাণিজ্য পুনর্দখল করেন। ১৬৩৮-৪১ সালের কান্দাহার অভিযান তাঁকে খ্যাতি দেয়, যদিও তা স্থায়ী সাফল্য আনেনি।
যদুনাথ সরকার লিখেছিলেন— “Shah Jahan was a statesman who preferred grandeur to conquest.” অর্থাৎ, তাঁর জন্য রাজনীতি ছিল জয়ের নয়, স্থায়িত্বের। তিনি যুদ্ধের চেয়ে শৃঙ্খলা ও সৌন্দর্যকে বেশি গুরুত্ব দিতেন। শাহজাহান শুধু সেনাপতি নন, ছিলেন এক গভীর মানবিক সম্রাটও। ১৬৩০-৩২ সালের ভয়াবহ দুর্ভিক্ষে লক্ষ লক্ষ মানুষ অনাহারে মারা যায়। শাহজাহান ব্যক্তিগত তহবিল থেকে ত্রাণ বিতরণ করেন, রাজস্ব মওকুফ করেন, রাজধানীতে লঙ্গরখানা খুলে দেন। তাঁর রাজনীতিতে ধর্মের চেয়ে বড় ছিল মানুষ। রাজকর্মচারীদের বেতন থেকে শুরু করে সাধারণ প্রজার জমি পর্যন্ত—সব ক্ষেত্রেই তিনি ন্যায়বিচার বজায় রেখেছিলেন।
রমেশচন্দ্র মজুমদার মন্তব্য করেছিলেন— “Shah Jahan’s rule marked the last zenith of Mughal prosperity before the empire began to decay under Aurangzeb.” অর্থাৎ, শাহজাহানের আমল ছিল মুঘল জৌলুসের শেষ শিখর, এরপর থেকেই সূর্য নামতে শুরু করে। শাহজাহানের নাম আজও বেঁচে আছে তাঁর স্থাপত্যে। তাজমহল, লালকেল্লা, জামা মসজিদ, শালিমার বাগ—এই সবই শুধু রাজকীয় নয়, এক শিল্পীর আত্মপ্রকাশ। যদুনাথ সরকার মন্তব্য করেছিলেন— “He was the Michelangelo of Asia.” অর্থাৎ, শাহজাহান এশিয়ার মাইকেলেঞ্জেলো—যিনি পাথরে প্রাণ দিয়েছিলেন। তাঁর নির্মিত লালকেল্লার স্থাপত্যে যেমন রাজশক্তির প্রতীক, তেমনই জামা মসজিদে ধর্মীয় মহিমা। শালিমার বাগ, মোতিমহল, ও দিল্লির ময়ূর সিংহাসন—সবই যেন এক সম্রাটের আত্মমুগ্ধতা ও নন্দনতত্ত্বের সীমানা।
কিন্তু ইতিহাসের যেমন জোয়ার আছে, তেমনি ভাটা। ১৬৫৮ সালে তাঁর নিজের পুত্র আওরঙ্গজেব রাজদণ্ড দখল করে তাঁকে বন্দি করেন আগ্রার লালকেল্লায়। যে রাজা একদিন সারা পৃথিবীর ধনরত্নের অধিপতি ছিলেন, সেই রাজা কাটালেন জীবনের শেষ আট বছর এক জানালার পাশে বসে—যেখানে থেকে দেখা যায় তাজমহল। প্রতিদিন সকালে তিনি তাকিয়ে থাকতেন সেই সাদা মার্বেলের দিকে, যেন সেখানে মিশে আছে তাঁর হারানো প্রেম। ১৬৬৬ সালের ২২ জানুয়ারি, যমুনার ধারে মৃদু বাতাস বয়ে যাচ্ছিল, শাহজাহানের প্রাণস্রোত থেমে গেল। তাঁকে মুমতাজের পাশেই সমাধিস্থ করা হয়।
এ যেন ইতিহাসের এক অলৌকিক পূর্ণবৃত্ত—প্রেম থেকে মৃত্যু, মৃত্যু থেকে অমরত্ব। এ প্রশ্ন আজও ইতিহাসবিদদের মধ্যে বিতর্কের কেন্দ্র। রমেশচন্দ্র মজুমদার বলেছিলেন— “Posterity remembers Shah Jahan more as a lover than as a ruler.” যদুনাথ সরকার বলেছিলেন— “He was the emperor who ruled the hearts before ruling the lands.” আমাদের কাছে শাহজাহান কেবল তাজমহলের স্রষ্টা নন, তিনি এক প্রতীক—যেখানে প্রেম, ক্ষমতা, শিল্প ও মানবিকতা মিলেমিশে গেছে। তাঁর জীবন এক শিক্ষা—যে শক্তি যদি প্রেমহীন হয়, তবে তা নিষ্ঠুর; আর প্রেম যদি শক্তিহীন হয়, তবে তা অসহায়।
শাহজাহান ছিলেন এমন এক সম্রাট, যিনি রাজনীতি ও কবিতাকে একসূত্রে বেঁধেছিলেন। তাঁর হাতে গড়া তাজমহল স্থাপত্য নয়, এক নিঃশব্দ সঙ্গীত—যা সময়কে অতিক্রম করে বলে, “প্রেম কখনও মরে না।” তাঁর শাসন আমাদের শেখায়— বিজয়ের থেকেও মহৎ হলো সৃষ্টির আনন্দ, ক্ষমতার থেকেও অমর হলো অনুভবের গভীরতা। আর আজও যখন চাঁদের আলোয় তাজমহলের গায়ে পড়ে সাদা দীপ্তি, মনে হয় যেন সম্রাট শাহজাহান এখনও ফিসফিস করে বলছেন— “আমি মরে গিয়েও বেঁচে আছি, কারণ মুমতাজ এখনও আলো হয়ে ঝলমল করছে।” এই গল্প ইতিহাসের নয়, হৃদয়েরও— যেখানে এক সম্রাটের হৃদয় অমর হয়ে উঠেছিল ভালোবাসার স্থাপত্যে।















Comments »
No comments yet.
RSS feed for comments on this post. TrackBack URL
Leave a comment