Writer –সুমন কুমার চন্দ্র (EE’98)
তিলোত্তমা কোলকাতা, কোলকাতার তিলোত্তমা
একজন ডাক্তার, মানুষের জীবনরক্ষায় অঙ্গীকারবদ্ধ,
সাধারণ ঘরের এক অসাধারণ মেয়ে
মা-বাবার সাথে নিজের স্বপ্নপূরণের সবে শুরু
তবে ওই যে, তুমি তো সাধারণ ঘরের আর তুমি যে মেয়ে!
সাধারণ ঘরের মেয়ে লাঞ্ছিতা, ধর্ষিতা বা পাশবিকভাবে হত্যা
হলেও তা হতে পারে না
এদের হত্যা করা হয় না, এরা আত্মহত্যা করে
এদের আগে হয় সিদ্ধান্ত, পরে হয়ত বা খতিয়ে দেখা
আর এই মিথ্যেটাই সত্য করে প্রমাণ করা হয়।
সত্যও তো ঠিক করে ক্ষমতাবানেরা,
ওফ্! ক্ষমতার কি প্রবল দাপট….
তিলোত্তমা-রা ধর্ষিতা হয় স্থান-কাল-পাত্র বিবেচনার অভাবে, পোশাকের জন্যে,
এদের শরীর-মন-মান-অপমান-বোধের অধিকারও
এদের নিজেদের নয়
আর দশ লক্ষের বেশী কতই বা দাম এদের জীবনের!
এই তো সাধারণ ঘরের মেয়েদের বাস্তব গল্প
হোক না ও মেয়ে অসাধারণ,
হোক না এই একুশ শতকের ঝাঁ চক্-চকে পৃথিবী
যখন উন্নতির চিহ্ন দুয়ারে-দুয়ারে,
এ কোন দিকে আমরা এগিয়ে চলেছি?
তবে এবার কিন্তু তা হয়নি তিলোত্তমা!
লাখে-লাখে মানুষ আজ ফুঁসছে
রাগে-ঘৃণায়-যন্ত্রনায় আর মানবিকতার তাড়নায়,
প্রতিবাদে নেমেছে লক্ষ-লক্ষ মানুষ,
বিদ্বজন হবার দরকার নেই, মনুষ্যত্ব আর সাধারণ বিবেক-বুদ্ধি টুকুই যথেষ্ট,
মানুষ, সাধারণ-মানুষ আজ বিচার চায়
শুধু একটা ফাঁসিই এর বিচার নয়,
লোকদেখানো, লোকঠকানো বিচার তো নয়ই,
একটা অব্যবস্থার ফাঁসি, একটা অরাজকতার ফাঁসি,
মুখোশ খোলার বিচার।
বানানো গল্পগুলো পা দিয়ে মাড়িয়ে আসল সত্যিটা সামনে আসুক,
সবার সামনে।
রাঘব বোয়ালগুলো সামনে আসুক।
তাদের কার্যকলাপ, মানসিকতা, ক্ষমতা
ধর্ষকের যৌনাঙ্গের মতই ভয়ঙ্কর!
তোমার ডায়েরীতে কি লেখা ছিল জানি না তিলোত্তমা,
তোমার কষ্টের কথা ঠিক জানি না আমরা
তবে যেটুকু অনুভব করি
তোমার শেষদিনের বা শেষ ক’ঘন্টার কথা ভেবে
রক্ত হিম হয়ে যায়
অবশ হয়ে যাই – শুধু একটু ভাবলেই!
বনের হিংস্র জানোয়ারগুলোর কবলে পরলেও
যন্ত্রণাটা এত ভয়ঙ্কর হত না,
চিৎকার শোনারও কেউ নেই,
আর সাধারণ ঘরের একটা মানুষের মুখ চাপা কি এমন কঠিন?
আকাশ ভাঙ্গার পরে অসহায় বাবা-মা, জানে না কি করবে,
আর শাসানি তো শাসকের ভূমিকা – যে রঙেরই হোক,
ক্ষত-বিক্ষত মরা মেয়েকে নিজেদের কাছে পাবার কি করুণ আর্তি!
তার ওপর ওপর-মহলের কত রকমের নির্দেশিকা!
অন্ধ আশাবাদী আমি নই,
তিলোত্তমাদের ইতিহাস আমায় আশা দেয়ও না,
তার ওপর আমি অতি স্বার্থপর, আমরা স্বার্থপর প্রজাতি,
নিজের ঘরে বাজ না পরলে নিজেকে নিয়েই বাঁচি,
কি হবে সমাজ, দেশ, পৃথিবী – এসব নিয়ে ভেবে!
প্রতিবাদের আগুন কবেই নিভে গেছে,
শুধু বাকচাতুরী আর অন্যের নিন্দে করেই তো কাটাই জীবন,
সমাজ, দেশ, সরকার – আমাদের নীরবতারও ফসল।
তবে আজ যেন আবার আশা দেখছি তিলোত্তমা!
না – মুখ্য বা গৌণ কোনো মন্ত্রীদের জন্য নয়,
তিলোত্তমারা ঘটে সব জমানায়
তাই কোনো রঙ-য়েই আশা নেই,
প্রশাসনের জন্য তো নয়ই – সে তো প্রহসণ,
সে তো পকেটে পুড়ে ফেলেছে ওরা কবে!
আশা দেখছি ওই লক্ষ-লক্ষ মানুষের নির্ভীক প্রতিবাদে,
তিলোত্তমা কলকাতায়, সারা দেশে ও বাইরে…
বিভিন্ন রং-য়ের নোংরামির মাঝেও
লক্ষ মানুষের সোচ্চার প্রতিবাদে,
যাদের মনুষ্যত্ব, বিবেক আজও বিকোয়নি
যেমন বিকিয়েছে বহু ক্ষমতাবানের, মেরুদন্ডও!
তিলোত্তমা, আজ আশা জাগে মেয়েদের রাত দখল করার গর্জনে,
স্বাধীনতার দিনে পরাধীনতা থেকে মুক্তির আওয়াজে,
শহর-গ্রাম-দেশ-বিদেশের কোণ থেকে, প্রতিবাদে।
জানি না কতদিন এ আগুন জ্বলবে
তবে এ প্রতিবাদ দেখিয়ে দিয়েছে যে
রাজা তুই উলঙ্গ, রং-এ কি যায়-আসে, তুই উলঙ্গ
আর বীর্যপাতও তোদের হয়ে গেছে।
তবে আইন চায় প্রমাণ
আর বীর্যবানেরা পারে তা লোপাট করতে,
যারা হয়-কে-নয় করে, কত কিছু নয়-ছয় করে।
হয়ত এর পরেও আসল প্রমাণ মিলত যদি কেউ
জিজ্ঞাসা করত আর জি করের অলিন্দগুলোকে বা
সেমিনার ঘরের দেওয়াল গুলোকে বা মেঝে-কে,
মাথার ওপরের সাক্ষী সিলিং ফ্যান গুলোকে
বা ঘরের চেয়ার বা প্রজেক্টার-কে
কিংবা ওই অভিশপ্ত ঘরে আটকা পরে থাকা অবশিষ্ট কিছু বাতাস-কে,
কিন্তু ওরা তো নীরব সাক্ষী!
তিলোত্তমা তুমি আজ ঘুমাও,
তিলোত্তমাদের শেষ হয়ত এখানেই নয়,
তোমার কষ্ট-যন্ত্রণা আমরা ভাগ করতে পারিনি তিলোত্তমা
তবে এই কোলাহলে ভরা পৃথিবী থেকে আজ দূরে থাকো,
চির নিদ্রায় থাকো।
যদি এই লক্ষ-লক্ষ মানুষের প্রতিবাদ সফল হয়
যদি তিলোত্তমা ঠিক বিচার পায়
শান্তি পাবে আগামী দিনের তিলোত্তমারা
শান্তি পাবে তোমার অসহায় মা-বাবা
আর হয়ত শান্তি পাবে তোমার অমর আত্মা।
আজ তুমি ঘুমাও তিলোত্তমা!
The writer’s sense of pain in his language.
Comment by dchaudhuri — August 19, 2024 @ 4:50 pm