This trip was taken in 2015. original date of publication was August 23, 2015
হাওয়াই দ্বীপের অভিশপ্ত লাভারক্ কৃষ্ণা চৌধূরী
হাওয়াইতে এটা হচ্ছে জেনী আর ক্রেগের চতুর্থ দিন থাকা। এই তিন দিন যা দেখেছে তারা সারাজীবন তাদের পাথেয় হয়ে থাকবে। এরপর আবার হনুলুলুতে ফিরে গিয়েও কিছু দ্রষ্টব্য থাকবে। কাজের মানুষদের বেড়াতে যাওয়ার জন্য একটা বিরাট ছুটির প্রয়োজন থাকে। যেহেতু তারা দুজনেই প্রফেশনাল তাই কম সময়ের মধ্যেই তাদের বেড়ানো সারতে হয়।
আজকে তাদের গন্তব্যস্থল হলো হাওয়াইয়ের বিখ্যাত volcano (আগ্নেয়গিরি)। সকালে ঘুম থেকে উঠতে একটু দেরীই হয়ে গেল কারন আগেরদিন রাত্রে পলিনেশিয়ান ভিলেজ (Polynesian village) থেকে ফিরতে প্রায় রাত দুটো আড়াইটে হয়ে গিয়েছিলো।
“আজকে তো volcanoটা হেলিকপ্টারে চড়েই দেখব আমরা তাই না”? জেনী জিজ্ঞেস করল ক্রেগকে।
“দেখি, ওদের তো বলেছি যে কাল আমরা এখান থেকে চলে যাব। এখনও তো কোনও উত্তর পেলাম না”। বলতে বলতেই ফোন বাজলো। জেনী মুখ ধুতে বাথরুমে গেল। ক্রেগ ফোনটা ধরল। বাথরুম থেক জেনী বেরোতেই ক্রেগ বলল, “ওরা আজকে দিতে পারলো না। কালকে সকালে একটা ফ্লাইট আছে। কিন্তু বড্ড বেশী দাম চাইছে। আমাদের plane fare থেকেও বেশী”।
“কত”? জেনী জানতে চাইল।
“প্রায় চারশো এক এক জনের”।
“ওরে বাবা, এরা মানুষ মারবে নাকি”?
“নেবে flight? একেবারে volcanoর মুখের সামনে নিয়ে যাবে”।
“কতজন লোক থাকবে হেলিকপ্টারে”?
“মাত্র চারজন আর দুজন পাইলট”।
“কিন্তু কালকে তো আমরা চলেই যাব”, জেনী বলল।
“আমাদের flight তো সন্ধেবেলা সাতটায়”।
“আর এটা কখন”?
“সাড়ে এগারটায়”।
“দেখ এই একবারই তো যাব। আর তো কোনওদিন হবেনা। চল দেখেই আসি”।
ক্রেগ লোকটাকে ফোন করল, বলে দিল তারা যাবে। সমস্ত information লিখে নিল, credit card এর নম্বর দিয়ে দিল। সব ব্যবস্থা হয়ে যাওয়ার পর ক্রেগ বলল, “চল আমরা তাহলে volcano crater (ক্রেটার) দেখতে যাই”।
“সেখান থেকেও তো volcano দেখা যায় তাই না”?
“খুব একটা ভাল নয়। তবে ওখানে রাত্রের অন্ধকারে যেতে হয়”। ক্রেগ বলল।
আজকের দিনটা ওরা হোটেলের রেস্টুরেন্টে Bruch (breakfast & lunch) খেল। তারপর volcano crater এর খবর নিল। জানতে পারল এখান থেকে ঘন্টা দেড়েকের রাস্তা। তবে সকলের পায়ে sneaker, লম্বা প্যান্ট পরা থাকতে হবে এবং হাতে টর্চ ও জল থাকা চাই। সন্ধের সময় ওখানে যেতে হয়।
সারাদিন ওরা বাজার দোকান ঘুরে, বিকেলের দিকে হোটেলে ফিরে সব জিনিষপত্র গুছিয়ে রেখে প্রয়োজনীয় জিনিষগুলি নিয়ে volcano crater এর দিকে রওনা দিল। নির্দ্দিষ্ট রাস্তা ধরে যেতে যেতে সূর্্য ডুবে গেল। রাস্তাটা ক্রমশঃ সরু হতে হতে প্রায় একটমাত্র গাড়ী যাওয়ার মতো সঙ্কীর্ন হয়ে গেল। একজায়গায় এসে ওরা দেখে সাইনবোর্ড লাগানো রয়েছে ‘No Entry’। দেখে ওরা হতভম্ব হয়ে গেল। তবে কি ভূল রাস্তায় এসেছে? ‘ওমা দেখ, ঐ গাড়ীটা কি করে আমাদের পাশ কাটিয়ে ভেতরে ঢুকে গেল? চল আমরা ওর পেছনে পেছনে যাই”, জেনী বলল। ক্রেগ তাই করল। গাড়ীটার পেছন পেছন এগোতে লাগলো। দুপাশের বিশাল বিশাল পাহাড়ের পেছনে সূর্্য ডুবে গিয়ে অন্ধকার হয়ে আসছে।
একটুখানি যাওয়ার পর দেখা গেল অনেক গাড়ী দাঁড়িয়ে আছে। ওরা গাড়ী পার্ক করে দেখতে পেল কিছু লোক হলুদ রংয়ের ইউনিফর্ম পরে সবাইকে বলে দিচ্ছে ‘লাভারকের ওপর হলুদ নিশানা রয়েছে এবং পাশে পাশে হলুদ রং রয়েছে। সেই সেই রাস্তা ধরে আপনারা যাবেন ও ফিরে আসবেন। মনে রাখবেন আপনারা আগ্নেয়গিরির ওপর দিয়ে চলেছেন, যেখানে সেখানে পা ফেললে একেবারে আগুনের খাদে পড়ে যাবেন”।
সারা তল্লাটটা কালো পাথর মানে লাভারকে ভর্ত্তি। এটা আসলে একটা পাহাড় যেটা সমুদ্রে গিয়ে মিশেছে। এখানেই কালকে আসবে তারা, শুধু হেলিকপ্টারে চড়ে ওপর থেকে দেখবে।
দুজনে খুব সাবধানে হলুদ কাগজ আঁটা লাভা পাথরেরে ওপর সাবধানে পা ফেলে ফেলে চলেছে। তাদের সামনে পেছনে বহু লোক, বুড়ো, বাচ্চা, জোয়ান মেয়ে, পুরুষের মিছিল। এদের মধ্যে যারা হেলিকপ্টারে করেও ঘুরে এসেছে তারা বলতে বলতে যাচ্ছে যে এই Journey টা অনেক বেশী Adventurous. প্রায় আধঘন্টা কি তারও বেশীক্ষণ ধরে হেঁটে তারা সমুদ্রের উপকূলে যেখানে লাভার পাহাড় মিশেছে জলের সাথে সেখানে পৌঁছাল। অন্ধকার হয়ে এসেছে, এপাশ ওপাশ থেকে ক্রমাগত ধোঁয়া উঠছে। পায়ের তলায় মাঝে মাঝে উত্তপ্ত পাথরের সন্ধান পাচ্ছে তারা। আর দূরে দেখা যাচ্ছে সমুদ্রের মধ্যে জলন্ত লাভা ক্রমাগত পড়ে যাচ্ছে। ঐ জায়গাটাকে বলা হয় Dragon’s Mouth. এখান থেকে ওরা পুরোপুরি দেখতে না পেলেও চারিদিকের অন্ধকার হয়ে যাওয়া কালো পাথরের পাহাড়ের উপর দাঁড়িয়ে সমুদ্রের জল থেকে যে ধোঁয়া উঠছে আর গনগনে লাল রংয়ের আগুন দেখে সবাই খুব উত্তেজিত। সবাই ছবি তুলতে ব্যস্ত। ফস্ ফস্ করে ক্যামেরার ফ্ল্যাশ উঠছে, ওরাও কিছু ছবি তুলল। এবার ফেরার পালা।
ফেরবার ওরা দুজনেই দুটি লাভারক্ তুলে হাতে করে পরখ করতে করতে গাড়ীর মধ্যে ঢুকল। হোটেলে ঢুকে জেনী আর একবার জিনিষপত্র স্যুটকেশে গুছিয়ে রাখলো। কাল হেলিকপ্টার রাইড নেবার পর আর বেশী
সময় থাকবেনা। লাভারক্ দুটি টেবিলের ওপর রেখে দিল। কালকে স্যুটকেশে ঢোকাবে।
সকালবেলা দুজনে যখন ব্রেকফাস্ট খেতে গেল তখনই ওরা হোটেলের বিল মিটিয়ে দেবে ঠিক করল। ‘তুমি ওপরে যাও আমি check out করে আসছি’, ক্রেগ বলল।
‘ঠিক্ আছে’, বলে জেনী ওপরে চলে গেল। ভিতরে ঢুকে সমস্ত জিনিষপত্র ঠিক করে দরজার কাছে রাখল। লাভারক দুটি একটা কাগজে মুড়ে Rollaway ব্যাগে ঢোকাল। এটা চমৎকার Souvenir হবে হাওয়াইয়ের। এর মধ্যেই ক্রেগ ফিরে এল, এসেই চীৎকার করে উঠল, “জেনী শিগগির্ লাভারক্ ফেলে দাও, ওগুলো অভিশপ্ত। এখান থেকে কেউ লাভারক্ নিয়ে যায়না”।
জেনী হতভম্ব, “সে কি কেন”?
“মোটেলের মেয়েটা বলল শীগগির ফেলে দিতে। ওখানে নোটিশ লাগানো ছিলো”।
“আমরা অন্ধকারে নোটিশ পড়তে পারিনি”। জেনী বলল। তাড়াতাড়ি স্যুটকেশ খুলে পাথর দুটি বার করে ছুঁড়ে বাইরে ফেলে দিল। ভয়ে তার মুখ সাদা হয়ে গেছে।
“নাও আর বেশী সময় নেই এখন হেলিকপ্টার রাইড নিতে যেতে হবে”। এরপর হেলিকপ্টার চড়ে তাদের যা দুর্গতি হলো তা বলার নয়। হেলিকপ্টার তো তাদের Dragon’s Mouth এর কাছে নিয়ে গেল। সেখানে আর দুজন যাত্রী ছবি তোলার চেষ্টায় ক্যামেরাটি হাত
থেকে ফস্কে পড়ে গেল। তারা খোঁজাখুঁজি করতে গিয়ে কি করেছে কে জানে, পাইলটটি ভয় পেয়ে একটা ভূল বোতাম টিপে দিয়েছে, আর পুরো হেলিকপ্টারটা একেবারে লাভাস্রোতের কয়েক ফুট দূর উপর পয্যর্ন্ত বেগে পৌঁছে গেল। চারজনে মিলে এতজোর চেঁচিয়ে উঠল যে মনে হলো তারা জীবনে শেষ ধাপে পৌঁছে গেছে। আরেকজন পাইলট খুব বুদ্ধি করে আরেকটি বোতাম টিপে হেলিকপ্টারের মুখটা ঘুরিয়ে দিয়ে তাদের বাঁচালো।
দুজনে প্রাণ হাতে করে মোটেলে ফিরল, এবার এখান থেকে ওরা সোজা এয়ারপোর্ট যাবে। এখন আড়াইটে বাজে, এয়ারপোর্টও খুব দূরে নয় তবু ওরা এখনই বেরিয়ে গিয়ে এয়ারপোর্টে বসে থাকবে। আর এ তল্লাটেই থাকবেনা তারা।
“তুমি ছোট স্যুটকেশ আর জলের ফ্লাস্কটা নিয়ে এস, আমি বড় স্যুটকেশটা গাড়ীতে তুলে দিয়ে আসছি”, ক্রেগ বলল।
ক্রেগ বেরোবার দুমিনিট পরেই জেনী আরেকবার সব কিছু দেখে নিয়ে ঘরের দরজাটা বাইরে থেকে টেনে বন্ধ করে হলওয়েতে এল। হলওয়ের শেষ প্রান্তে পৌঁছে সিঁড়ি দিয়ে নামতে শুরু করল। প্রায় শেষের দিকে নেমে এসেছে, হঠাৎ পা পিছলে জেনী ভীষণ জোরে হোটেলের ফয়ারে (Foyer) মুখ থুবড়ে পড়ল। ডান হাতটা পিঠের তলায় মুড়ে গেছে। কপালে জোরে ফ্লাস্কটা লেগে উল্টে গেছে। স্যুটকেশটা ঘাড়ের ওপর, একটা পায়ে দারুণ চোট লেগেছে। কয়েক মিনিট ধরে জেনী বুঝতেই পারলনা কি হয়েছে। এদিকে গাড়ীর হর্ন শোনা যাচ্ছে, এখানে হর্ন বেশী কেউ বাজায় না। ক্রেগই দুচারবার হর্ন বাজালো মনে হয়। জেনী উঠতেই পারছেনা।
ডান হাতটায় কোনও অনূভুতিই নেই। এতবার হর্ন দিয়ে সাড়াশব্দ না পেয়ে ক্রেগ নিজেই চলে এসেছে। “কি সর্ব্বনাশ, পড়লে কি করে”?
“জানিনা, বোধহয় একটা সিঁড়ি skip করে ফেলেছি”। এদিকে মোটেলের দুচারজন পরিচারিকা ছুটে এসেছে। ক্রেগ ও তাদের সাহায্যে উঠে বসল জেনী কিন্তু ডান হাতটা তুলতে পারছেনা। এক্ষুনি তাকে হাঁসপাতালে যেতে হবে, মনে হয় Fracture হয়েছে। ক্রেগ মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়ল।
হাঁসপাতালে যাওয়া, হাতের X-ray, crust এই সমস্ত করতে আরও দুঘন্টা সময় গেল। এয়ারপোর্টে পৌঁছে দেখে প্লেনে বোর্ডিং শুরু হয়ে গেছে। কোনওমতে প্লেনে উঠে তারা হনুলুলুতে পৌঁছাল। কিন্তু তখন কি তারা জানতো যে অভিশপ্ত লাভারক তোলবার দণ্ড দেওয়া তাদের এখনও শেষ হয়নি।
পরের দিন সকাল সাড়ে নটায় ওদের প্লেন বাড়ী ফিরে আসবার জন্য। হনুলুলু থেকে ৯ ঘন্টার Journey. সকাল ছটার মধ্যে তারা তৈরী হয়ে কোনওমতে নীচে নামল। এবার তারা মোটেলের পরিচারিকাদের সাহায্য নিয়েই নামল। ক্রেগ গাড়ীর চাবির জন্য পকেটে হাত দিতেই দেখে চাবি নেই। আবার মাথায় হাত, চাবি কোথায়, চাবি কোথায়। পার্কিং লটে বসে সমস্ত ব্যাগ, স্যুটকেশ খুলে খোঁজাখুঁজি। না কোথাও নেই। গাড়ী এয়ারপোর্টে ফেরৎ দিতে হবে। জেনীর ভাঙ্গা হাত নিয়ে সে কিছু করতে পারছে না, ক্রেগকে একাই সব করতে হচ্ছে।
“চল মোটেলের ঘরে ঢুকে আর একবার খুঁজে দেখি”, জেনী বলল। “তাই চল”, ক্রেগের উত্তর। দুজনের মুখ শুকিয়ে গেছে। মোটেলের পরিচারিকা দুটিরও ওদের দুর্দশা দেখে দুঃখ লাগলো। একজন তো বলেই ফেলল “তোমরা কি লাভারক তুলেছিলে বাড়ী নিয়ে যাওয়ার জন্য”?
ওরা আশ্চর্্য্য হলো, “হ্যাঁ কিন্তু তোমরা কি করে জানলে”?
“যারাই এরকম করে তাদেরই দুর্ঘটনা ঘটে তোমাদের মতো। এজন্য চারিদিকে Warning দেওয়া আছে লাভারক না তুলতে”। আঙ্গুল তুলে দেখিয়ে দিল একটা সাইনবোর্ড। “এটা হনুলুলু কিন্তু এখানেও নোটিশ দেওয়া রয়েছে”।
ওপরে উঠে ওরা ঘর তন্ন তন্ন করে খুঁজে দেখল। না কোথাও চাবি নেই। হঠাৎ জেনীর কি মনে হল, ড্রয়ারটা খুলে দেখল। ডানহাত ব্যবহার করতে পারছেনা, তাই বাঁহাত ঢুকিয়ে হাতরালো। একি একেবারে কোনার দিকে মনে হচ্ছে কিছু আটকে আছে। কোনওমতে খুব কষ্ট করে আরও ভেতরে বাঁহাতের কড়ে আঙ্গুল দিয়ে ড্রয়ারের শেষ প্রান্তে আটকে থাকা চাবিটা জেনী টেনে বার করল। ছোট্ট একটা চাবি যেটা ক্রেগ ভেবেছিলো ওর চাবির গোছার মধ্যে ঢুকিয়ে রেখেছে, সেটা ড্রয়ারের কোনাতে আটকে ছিল।
সব কিছু সামলে সুমলে যখন ওদের প্লেন ছাড়লো জেনী দুহাত তুলে লাভারককে প্রণাম করে বলল, “আর যেন কেউ হাওয়াই বেড়াতে এসে ভূলেও না অভিশপ্ত লাভারক তোলে বা আনে সেটা আমি সবাইকে জানিয়ে দেব”।
Comments »
No comments yet.
RSS feed for comments on this post. TrackBack URL
Leave a comment