হোপাটকং শহরটাকে বলা হয় বেডরুম কম্যুনিটি। এখানে লোকজন আসে, কিছুদিন বাস করে, শহরে বা কাছাকাছি জায়গায় কাজকর্ম্ম থাকলে শেষ করে তারপর যে যার জায়গায় ফিরে যায়। এখানে যারা বসবাস করে তাদের প্রত্যেকেরই কিছু না কিছু ব্যাবসা বা দোকান বাজারে আছে। চাকরী বাকরী করে এরকম লোকজন এখানে কমই আছে। গরমকালেই লোকজনের ভীড় একটু বেশী হয়। সামনেই একটা মনোরম লেক রয়েছে, লোকজন সকালবেলা ব্রেকফাস্ট শেষ করে জিনিষপত্র গুছিয়ে বেঁধেবুঁধে বেলা বাড়বার আগেই পার্কে ঢুকে পড়ে। তারপর একটা মনোরম জায়গা জলের ধারে বেছে নিয়ে মোটা চাদর, ব্ল্যাঙ্কেট বা বড় বসবার বীচ টাওয়েল পেতে নিজেদের সীমানা নির্দ্দেশ করে ছেলেপুলে খাবার দাবার নিয়ে গুছিয়ে বসে যায়। সারাদিন ছেলেমেয়েরা জলের মধ্যে ঝাঁপাঝাঁপি করে, স্পীডবোট্ ভাড়া পাওয়া যায়, যারা পারে তারা বোট্ ভাড়া করে ঘোরে, বিরাট বড় মাঠে ছেলে বুড়ো নানান্ রকম খেলাধূলো করে সন্ধের মুখে আবার জিনিষপত্র বাঁধাবাঁধি করে রাত আটটা বাজার আগে যে যার ঘরে ফিরে যাবার জন্য তৈরী হয়। সকালবেলা স্টেট পার্কে ঢোকার সময় যেরকম ভীড় হয় সন্ধেবেলা বেরোবার সময়ও গেটের মুখে তার চেয়েও বেশী ভীড় লেগে থাকে। গাড়ীর লম্বা লাইন পড়ে যায়।
এইরকম একটা কম পয়সায় গরমকালে বেড়াতে যাওয়ার সুযোগ সারা বছরই পাওয়া যাবে ভেবে আমরা কর্ত্তা গিন্নী খুবই উৎসাহ নিয়ে একটা ছোটোমোটো বাড়ী কিনে ফেললাম। তখন তো ভাবিনি গরমকাল মাত্র দুমাসের জন্য, বাকি ১০ মাস এ অঞ্চলে ঠাণ্ডাই থাকে। যাক্, আমরা হোপাটকং শহরে বাড়ী কিনেছি শুনে আমাদের বন্ধু বান্ধবদের আমাদের বাড়ীতে আনাগোনা একটু বেড়েই গেল। কোনও কোনও উইকেণ্ডে দুতিনটি ফ্যামিলিও এসে পড়ত। অবশ্য তাতে আমাদের খুব যে একটা অসুবিধা হতো তা নয়। এমনিতেই আমরা দুজনে খুবই আড্ডাবাজ, আর আমাদের দুটি ছেলেও কিছু কম্ যায়না। সারাদিন স্টেট পার্কে গিয়ে হৈহৈ করতে পারবে ভেবে তারা আগের দিন রাত্রেই সব হোমওয়ার্ক সেরে রাখত আমরা কিছু বলার আগেই।
বন্ধুরা আমাদের ওপর কখনই চাপ সৃষ্টি করতনা। যথেষ্ট খাবার দাবার তৈরী করে আনত, আমরা পার্কে বসে সারাদিন খাওয়া দাওয়া সেরেও বহূৎ খাবার থেকে যেত যেগুলির সদ্ ব্যাবহার আমরাই পরে করতাম। আস্তে আস্তে নতুন জায়গায় আমরা মানিয়ে নিতে শুরু করলাম। পাশের দুই বাড়ীর প্রতিবেশীর সঙ্গে আলাপ হল, তারপর এদিক ওদিক দুচারজনের সঙ্গে। আমার স্বামীর কলেজের বন্ধু তো সারা বিশ্বচরাচরে ছড়ানো সুতরাং লোকজনের অভাব একেবারেই বুঝতে পারলাম না। আর ছেলেরা তো প্রথম দিনই পাড়ার ছেলেপিলেদের সঙ্গে বন্ধুত্ব পাতিয়ে ফেলল
আমরা গরমের ছুটিতে বাড়ী কিনেছিলাম তাই স্কুল টুল সব বন্ধ ছিলো। আগস্ট মাসের প্রথম দিকে স্কুলের অফিস খুললে বড় ছেলেকে ভর্ত্তি করে দিয়ে এলাম। আরও চাট্টি ছেলেপিলের সঙ্গে তার ভাব হয়ে গেল। সেপ্টেম্বরে স্কুল শুরু হয়ে গেল। ওমা দেখি স্কুল ফেরৎ গোটাকতক ছেলেপিলে সঙ্গে নিয়ে ঘরে ঢুকছেন তিনি। এ তো মহা আপদ। সারা সময় টঙ্গস্ টঙ্গস্ করে এই বয়স থেকে পাড়া বেড়াতে শুরু করলে তো গোল্লায় যেতে বেশী সময় লাগবে না। সেই উইকেণ্ডে দুই ছেলেকে বসিয়ে তাদের একটা রুটিন তৈরী করলাম, অবশ্য দুজনেরই মতামত নিয়ে। এ তো বাবা আমাদের দেশ নয়, বাপ মা যা বলবে শুনতেই হবে কোনও উপায় নেই তাই যস্মিন দেশে যদাচার নিয়ম মেনে চলাই ভালো।
আমরা যাই হোক এই শহরে কয়েকমাস ধরে ভালোই আছি। আমার ছেলেদের সঙ্গী সাথীর যে অভাব নেই সেকথা তো আগেই বলেছি। রোজই নতুন নতুন বন্ধুর আবির্ভাব হচ্ছে। এরই মধ্যে আমার বড় ছেলে সলিল খেলায় ভঙ্গ দিয়ে দেখি রান্নাঘরে এসে হাজির।
“কি ব্যাপার এইমাত্র তো খেয়ে দেয়ে খেলতে গেলে?” “মামি, জন হোয়াইটদের কুকুরের ছ’টা বাচ্চা হয়েছে। ওর মা বলল তুমি যদি রাজী থাক ওরা একটা বাচ্চা আমাকে দিতে পারে”।
“ঠিক আছে, সন্ধেবেলা বাবা ফিরে আসুক অফিস থেকে তখন জিজ্ঞেস করো”।
“না, মামি না, তুমি এখনই ফোন কর বাবাকে”, সে ছেলে নাছোরবান্দা। আমি তো জানিই বাবার উত্তরটা কি হবে। আমি হচ্ছি Woman আর উনি হচ্ছেন No-Man, যা বলব তাতেই ‘No’। ফোন করলাম, করে ফোনটা ছেলের হাতেই দিলাম। কিন্তু সে ছেলেও তো বাপের ব্যাটা। কি করে আঙ্গুল বেঁকিয়ে ঘি তুলতে হয় সাত বছরের ছেলেকে শিখিয়ে দিতে হ’লনা। ঠিক্ বাপকে রাজী করিয়েই ছাড়ল। একটু পরে দলবল সুদ্ধু ছেলে আমার একটি কুকুরছানা এনে হাজির করল।
“মামি দ্যাখো কুকুরটা কি সুন্দর”! সত্যিই দেখি একটা সাইবেরিয়ান হাস্কি, নাকটা শুধু সাদা, বাকি সারা অঙ্গ ব্রাউন আর হোয়াইট রং মেশানো। কুকুরের নাম রাখা হোলো ফ্লাফি। এই কুকুর নিয়ে বেশ ব্যাস্ত হয়ে রইল কদিন সলিল, তাকে খাওয়ান, চান করানো, বাইরে রোজ সকাল বিকেল ঘোরাতে নিয়ে যাওয়া ইত্যাদিতে। তারপর ব্যাস আমার ঘাড়েই পড়ল কুকুরের তদারকি। কয়েকমাস কেটে গেল। দুই ছেলে এবং কুকুর নিয়ে আমাদের সময় কেটে যাচ্ছে হৈ হৈ করে।
তারপর এক শনিবার আমার এক দূরসম্পর্কের দেওর আমাদের লাঞ্চ ও ডিনারের নেমন্তন্য করল। সাধারনতঃ ডিনারের নেমন্তন্য থাকলে কুকুরটাকে খাইয়ে দাইয়ে সব ব্যবস্থা করে যাই, কিন্তু লাঞ্চ আর ডিনার করতে গেলে অনেকটা সময় বাইরে থাকতে হবে। তাই আমি কর্তাকে বললাম, ‘তুমি চলে যাও ছেলেদের নিয়ে’। যার কুকুর তার মোটেই মাথাব্যাথা নেই, যত জ্বালা আমার। সে তার কাজিনদের সঙ্গে খেলাধূলা করতে পারবে সেই আনন্দেই মত্ত।
সারাটা দিন কেটে গেল, বিকেলবেলা ফোন এল কর্তার ‘ছেলেরা এখানে থাকতে চায়’, ‘ঠিক আছে থাক’, বললাম আমি। জায়ের সঙ্গে কিছুক্ষণ গল্পগাছা করে ফ্লাফিকে হাঁটাতে নিয়ে গেলাম। রাস্তায় জন হোয়াইটের মায়ের সঙ্গে দেখা হল। বিরাট চেহারা একখানা 5 by 5। আমাকে দেখে বলল ‘So Salil’s dog rearing novelty died down, uh’? হেঁসে উত্তর দিলাম, ‘But, of course’! মনে মনে বললাম, ‘হারামজাদী, তুমিই তো এর মূলে’।
রাত্রে ফ্লাফিকে নীচে utility রুমে ওর কার্ডবোর্ড বক্সের মধ্যে শুইয়ে আমি টিভি দেখতে বসলাম। সাড়ে দশটা এগারোটা নাগাদ শুতে চলে গেলাম। কতক্ষণ ঘুমিয়ে ছিলাম জানিনা, হঠাৎ ঘুমটা ভেঙ্গে গেল। উঠে বাথরুমে গেলাম, তারপর রান্নাঘরে একটু জল খেতে গেলাম। রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে ভাবলাম নীচে গিয়ে কুকুরটাকে একটু দেখে আসি। নীচে সিঁড়ির মুখে আসতেই আমি চমকে উঠলাম। সিঁড়ির তলায় সদর দরজায় মাথায় ওপর লাগানো স্কাইলাইটের আলো পড়ে আলোআঁধারীর মধ্যে একটা লোক দাঁড়িয়ে আছে। লোকটার মাথায় একটা পালকের তৈরী হেডব্যাণ্ড লাগানো, খালি গায়ে মনে হচ্ছে একটা বাঘের বা কোনও জন্তু জানোয়ারের ছাল পরা, দুহাতে ধরা একটা কুকুর। লোকটার চেহারাটা একটা রেড ইণ্ডিয়ানদের মতো। দেখে তো আমি আর দম্ নিতে পারছিনা, আমার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে, হাত পা ঠাণ্ডা হয়ে প্রায় পড়ে যাচ্ছি। আমি যেন স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি লোকটা আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আমি কোনওমতে নিঃশ্বাস রুদ্ধ করে দৌড়ে বেডরুমে এসে দরজা লক্ করে বিছানায় শুয়ে পড়লাম। মনে হল যেন অজ্ঞান হয়ে যাচ্ছি। ফোন তুলে যে কাউকে ডাকবো সেটুকু শক্তিও নেই শরীরে। মনে হচ্ছে এক্ষুনি লোকটা ওপর এসে আমাকে খুন করে ফেলবে।
কতক্ষণ এইরকম অর্ধ অচৈতন্য অবস্থায় পড়েছিলাম জানিনা। তারপর যখন একটু স্বভাবিক অবস্থায় ফিরলাম দেখি ঘড়িতে সাড়ে তিনটে বাজে। ফোন তুলে প্রথমেই কর্তাকে ফোন করলাম। ‘কি হয়েছে’? জিজ্ঞাসা করলেন। ‘একটা Red Indian লোক ঘরে ঢুকেছে’, ফিসফিস করে বললাম। ‘Horror Movie দেখে দেখে তোমার মাথাখারাপ হয়ে গেছে। হোপাটকঙে কোনও Red Indian নেই। আমি ফোন ধরে আছি, যাও গিয়ে দেখে এসো। বাড়ীতে এলার্ম দেওয়া আছে, কেউ ঢুকলে এতক্ষনে পুলিশ এসে যেত। যাও দেখে এস সব আমি ফোন ধরে আছি’। আমি আস্তে আস্তে উঠলাম। কোথাও কোনও সাড়াশব্দ পেলাম না। বেডরুমের দরজা খুলে, হলের আলো, কিচেনের আলো, সিঁড়ির আলো সারা বাড়ীর আলো জ্বেলে দেখলাম, কোথাও কিছু নেই। সাহস করে নীচে গেলাম। সব দরজা ভিতর থেকে বন্ধ, বাইরে থেকে কেউ আসতে পারেনা। Utility room এ কুকুরটাকে দেখতে গেলাম। গিয়ে দেখি কুকুরটা বমি করে সারা কার্ডবোর্ডটা ভাসিয়েছে। কুঁই কুঁই করে আওয়াজ করছে। ওপরে এসে কর্তাকে বললাম, ‘কোথাও কিছু নেই শুধু কুকুরটা বমি করেছে’। ‘ভূত কাতুরে, ভূতুরে, ভীতুরে’ বলে উনি ফোন রেখে দিলেন।
আমি কুকুরটাকে পরিস্কার করে তার বিছানাপত্র সব গ্যারেজে বার করে আর এক প্রস্থ বিছানা বার করে আমার বেডরুমের মেঝেতে পাতলাম। তারপর বাকী রাতটা কুকুরটাকে জড়িয়ে ধরেই ঘুমিয়ে পড়লাম। কুকুরটার নাক ডাকে কর্তারই মতো সুতরাং আমার ঘুমের কোনও অসুবিধা হলোনা।
দুদিন পরে দেখি মেলবক্সে একটা গাছের ছাল বা পাতার মতো জিনিসের ওপর ভূষোকালির মতো কিছু দিয়ে লেখা একটা চিঠির মতো। সেটা কি জানবার জন্য পাশের বাড়ীর প্রতিবেশী Adrianaকে জিজ্ঞাসা করলাম। কিছু বলতে পারলনা, আরও দুচারজনকে জিজ্ঞেস করলাম, কেউ কিছু বলতে পারল না। কর্তা বললেন ‘ওসব কিস্যু নয়, পাড়ার ছেলেরা নিশ্চয়ই খেলতে খেলতে গাছের পাতায় কাদা মাখিয়ে দুস্টুমি করে মেলবক্সে ঢুকিয়ে দিয়ে গেছে’। কিন্তু আমার অনুসন্ধিৎসু মন কিছুতেই সাড়া দিলনা তাতে।
পরের দিন লাঞ্চ খেয়ে ছোট ছেলে বুবুনকে নিয়ে Borough Hall এ গেলাম। সেখানে এই department সেই department ঘোরার পর একজন Handwriting Specialist এর দেখা পেলাম। ভদ্রলোকটিকে অনেকটা Red Indian দের মতো দেখতে।
উনি আমার হাত থেকে পাতাটা নিয়েই বললেন ‘এটা আপনি কোত্থেকে পেলেন’। ‘মেলবক্সে ছিল, আমি জানতে চাই এই লেখাটা কি এমনি আঁকাবুকি না এর কোনও তাৎপর্্য্য আছে’?
‘এই ভাষাটা হচ্ছে Algonquian ভাষা। Lenape Indian যারা এই অঞ্চলে বসবাস করত বহূৎ দিন আগে, এই পাহাড়টা যাদের দেশঘর ছিল, সাদা চমড়ার লোকেরা যাদেরকে নিজের দেশঘর থেকে উৎখাত্ করেছে তারা এই ভাষায় কথা বলত ও লিখত। এই লেখাটার মানে হচ্ছে আমি এখানে এসেছিলাম, I was here’। ভদ্রলোক ভয়ানক আশ্চ র্্য্য হয়ে গেলেন এই ভেবে যে আমি এটা পেলাম কি করে। আমি তখন ওনাকে সমস্ত ঘটনাটা খুলে বললাম। উনি সব শুনে বলেন ‘লেনেপিরা মানুষের মৃত্যুর পরে ১২ দিন পর্্য্যন্ত burial ground এ বসে শোকপালন করত।
১২ দিন লাগে একটি আত্মার মূল উৎসতে ফিরে যেতে। যখন মূল উৎসের কাছাকাছি আত্মাটি পৌঁছে যায় তখনই সে কিন্তু সেই অসীম আলোর গোলায় ঢুকতে পারেনা। তাকে একটি log বা pole পার হতে হয়। এই pole টিরই প্রতীক হচ্ছে totem pole যেটা সব Lenape Burial ground এ দেখতে পাওয়া যায়। যে জীবটি মানুষের আত্মাকে এই pole বা log পার হতে সাহায্য করে সে হচ্ছে কুকুর। মানুষের সুকর্ম বা কুকর্মের ওপর pole বা log এর দৈর্ঘ্যতা বাড়ে বা কমে। যদি মানুষ ভালো কাজ করে তবে log এর দৈর্ঘ্যতা কমে যায়। কিন্তু কুকুর ছাড়া ঐ log পার হওয়ার সাধ্য নেই কোনও আত্মার। আপনার যে কুকুরটি অসুস্থ হয়ে পড়েছিলো সেটা জানাবার জন্যই আপনার সামনে ঐ ছায়াটির আবির্ভাব হয়েছিলো’।
ওনার কথা শুনে আমার গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠলো। মনে মনে ভাবলাম তাহলে কুকুরই হচ্ছে স্বর্গের দ্বাররক্ষী। এরকম কথা তো আমাদের মহাভারতেও আছে, তাই না? যুধিষ্ঠিরও স্বর্গ দর্শন করতে পারেননি শুধু তাঁর কুকুরটিই পেরেছিলো।
ঘটনাটি সত্যিই অলৌকিক নয় কি?
Comments »
No comments yet.
RSS feed for comments on this post. TrackBack URL
Leave a comment