অগাস্ট ১৯৮০, কাটালোনিয়ার রাজধানী, ভুমধ্যসাগরের উপকূলবর্ত্তী শহর বার্সেলোনার রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছি, হাতে পর্যটন বিভাগের সৌজন্যে পাওয়া একটি মানচিত্র। বার্সেলোনার সব রাস্তার মোড় সমকোণ, শুধু শহরের এপার ওপার ফুঁড়ে যাওয়া বৃহত্তম রাস্তাটা তেরছা, তার নাম ডিয়াগোনাল (Diagonal)। তবে আমি যেখানে দাঁড়িয়ে তার নাম রামব্লাস (Ramblas), আমাদের পার্ক স্ট্রিটের মত, তবে অনেক বড়, অনেক বেশী দোকান। রাস্তায় হাতে গোনা যায় এমন কজন একা, কতিপয় ছোট পরিবার – এরা সম্ভবত স্থানীয়। বাকি সব ছোট বড় দল, পরে শুনলাম এরা দক্ষিণ আমেরিকান পর্যটক। ১০০% জনতা স্পেনীয়ভাষি, শুধু আমি ছাড়া। সবাই কলকল করে কথা বলছে, বিশেষ করে পর্যটকরা। বকবকানিতে কেউ যদি বাঙালিদের সঙ্গে পাল্লা দিতে পারে, সে কেবল স্পেনীয় আর ইটালীয়রা। ইউরোপের অন্যান্য দেশে অনেকে আমার সঙ্গে স্পেনীয় ভাষায় কথা বলার চেষ্টা করে – এরা বাঙালি আর স্পেনীয়র তফাৎ বোঝে না। তাই, আসার আগে তিনটি শব্দ মুখস্ত করে এসেছি, ‘নো আবলা এস্পানিওল / No habla Español’,মানে স্পেনীয় বলতে পারি না।
যাব সাগ্রাডা ফামীলিয়া (Sagrada Família)। বুঝতে পারছি আমি সেই চিত্তাকর্ষক ইমারতের খুবই কাছে আছি, কিন্তু দেখতে পাচ্ছি না। দেখেশুনে আমার কাছাকাছি বয়েসের সুশিক্ষিত চেহারার এক একলা যাত্রি পথচারীদের ধরলাম। এই ক ঘন্টায় জ্ঞান হয়েছে যে ইংরেজি বা জার্মান বলা নিরর্থক, তাই হাতের মানচিত্রটা দেখিয়ে বাংলায় বললাম, ‘আমি এখন এখানে, আমি এখানে যেতে চাই‘। মানচিত্রে সাগ্রাডা ফামীলিয়া বেশ স্পষ্ট করে দেখান আছে। ভদ্রলোক একবার দেখেই হাত নেড়ে নিজ ভাষায় এক গঙ্গা কথা বলে গেলেন, তার মধ্যে সাগ্রাডা ফামীলিয়া বার কতক শুনলাম। আমি বহু কষ্টে মনে করে মুখস্ত করা শব্দ তিনটে উচ্চারণ করলাম, ‘No habla Español’. বিদ্যুৎস্পৃষ্টের মত এক পা পিছিয়ে গিয়ে স্তম্ভিত হয়ে আমার দিকে কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে রইলেন। ‘ই কি রে বাবা? একটা দুপেয়ে প্রাণী,শার্ট, প্যান্ট পরা, মানুষের মত কথা বলছে, কিন্তু Español নয়। এ কোন গ্রহ বা নিহারীকা থেকে এল? পৃথিবীতে তো সবাই Español-ই বলে।‘ সম্বিত ফিরে পেয়ে ভদ্রলোক আমার হাতের বাজু ধরে হাঁটিয়ে নিয়ে চললেন। কয়েক পা এগিয়ে মোড়ে এসেই দেখতে পেলাম সেই সুউচ্চ, শিখরশোভিত, অনবদ্য, অনিন্দ্যসুন্দর, সহস্র বছর ধরে নির্মীয়মান,কিন্তু অসমাপ্ত গীর্জা। ভদ্রলোক কিন্তু আমার হাত ছাড়লেন না। আরও আধ কিলোমিটার হাঁটিয়ে, গাড়ি বাঁচিয়ে রাস্তা পার করিয়ে দিয়ে তবে ছাড়লেন, এইসঙ্গে চলল অনর্গল স্পেনীয় ভাষায় ধারাভাষ্য। তাও পাছে ভুল করি, তাই আঙ্গুল তুলে সেই অভ্রংলেহি অট্টালিকা দেখিয়ে দিয়ে বললেন, ‘Sagrada Família’. মাথা চুলকে কথাটা মনে পড়ল, বললাম, ‘গ্রাসিয়াস / Gracias’. ভদ্রলোক একটু হেঁসে আরও এক প্যারাগ্রাফ Español বলে বিদায় নিলেন।
Comments »
No comments yet.
RSS feed for comments on this post. TrackBack URL
Leave a comment