অপরিচিতা
ব্ল্যাক ডায়মন্ড এক্সপ্রেস এত ভোরবেলা ছাড়ে যে মানুষজনের ঘুমই ভাঙ্গে না সেই সময়। কিন্তু দূরপাল্লার দ্রুতগামী গাড়ী হিসাবে এই ট্রেনটার নাম খুব। অলক মাত্র ১ মাসের ছুটি নিয়ে এসেছে নিউইয়র্ক থেকে বিয়ে করবার জন্য। বাড়ী থেকে বহূ মেয়ে দেখা হয়েছে। তাদের মধ্যে বাছাবাছি করে যে কটা মেয়েকে সকলের পছন্দ হয়েছে তার মধ্যে দুতিনটি মেয়ে দেখতে অলক রাজী হয়েছে। বস্তুতপক্ষে এই মেয়ে বাছাবাছি করে বিয়ে জিনিষটাই অলকের কাছে ভীষন বিরক্তিকর। যেন বাজার থেকে আলু পটল বেছেবুছে কেনার মতো কিন্তু সাবেকী পুরোনো দিনের বনেদী বাড়ীতে জন্মাবার জ্বালা সহ্য করে তাকে এই সাত সকালে ভোরের জমাটি ঘুম ছেড়ে আসানসোলে যেতে হচ্ছে সেজমামার শালীর মেয়েকে দেখতে যেতে।
হাওড়া স্টেসনে ছোট মামা এসেছিলো ট্রেনে তুলে দিতে যদিও অলক বারণ করেছিলো, সে একাই চলে আসত। ট্রেনে উঠে একটা জানলার দিকে সীট দেখে অলককে বসিয়ে দিয়ে মামা বিদায় নিল। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই একটি ছিপ্ ছিপে চেহারার মেয়ে এসে ঊন্টো দিকের জানলার ধারে বসে পড়ল। অলকের মেয়েটিকে দেখেই ভালো লেগে গেল, শ্যামলা রং কিন্তু মুখখানি অতীব সুশ্রী। পানপাতার মতো মুখ, চোখ, নাক, ছোট কপাল কেমন একটা স্নিগ্ধতা এনে দিয়েছে মেয়েটির মুখে। একবার উঠে দাঁড়িয়ে বাঙ্কের ওপর ছোট হাতব্যাগটি রাখল। বেশ লম্বা দেখল অলক।
ট্রেন ঠিকসময়ে ছাড়ল। ভোরের সূর্্যের আলোটা মেয়েটির মুখের ওপর পড়েছ, অলকের মনে হলো এতদিন ধরে যে মেয়েগুলি দেখলো মুখে রংচং মাখা তাদের তুলনায় এই মেয়েটির অসজ্জিত চেহারায় অনেক বশী স্নিগ্ধতা।
“কোথায় যাবেন আপনি?”
“আসানসোল”, উত্তর দিল সে।
“ও তাই নাকি? আমিও আসানসোলে যাচ্ছি”। অলক বলল।
“আপনি কি আসানসোলেই থাকেন?’ আবারও জিজ্ঞেস করল অলক।
“হ্যাঁ” সক্ষিপ্ত উত্তর দিল মেয়েটি।
অলক আসানসোলের কিছুই চেনেনা। তাই চুপ করে গেল। ভাবল মেয়েটি হয়তো বিরক্ত হচ্ছে। কয়েক মিনিট পরে মেয়েটিই জিজ্ঞেস করল,
“আসানসোলের কোথায় যাবেন আপনি?”
এর উত্তরটা জানা ছিল অলকের। বলল “ঊষাগ্রাম”।
“ও তাই নাকি? ঊষাগ্রাম আমার খুব চেনা। ওখানে কাদের বাড়ীতে যাবেন?”
“ডক্টর সুধীর ব্যানার্জির বাড়ী। উনি আমার সেজমামা”।
এবার মেয়েটির মুখে হাঁসি ভর্ত্তি, বলল, “ওনার মেয়ে মিতুন মানে জয়িতা আমার বন্ধু, আমরা একক্লাসে পড়েছি”।
এবার অলক বেশ ভালো করে আলাপ জমাতে সুবিধা হবে বুঝতে পারল। মেয়েটির নাম রিণি দাসগুপ্ত, বাবা সাউৎ ইর্স্টান রেলওয়েতে কাজ করেন। বাকি রাস্তাটুকু গল্প করতে করতে কোথা থেকে যে কেটে গেল বুঝতেই পারল না অলক। স্টেসনে সেজমামা গাড়ী পাঠিয়ে দিয়েছিলেন, ভেবেছিলো রিণিকে ওদের বাড়ীতে নামিয়ে দেবে কিন্তু ট্রেন থেকে নেমেই রিণি বিদায় নিয়ে চলে গেল। যাক্ মামার বাড়ীতে পৌঁছে স্নান খাওয়া দাওয়া সেরে একটু বিশ্রাম নিল অলক, বিকেলে আবার মামার শালীর মেয়ে দেখতে যেতে হবে। মিতুনের খোঁজ করল, সবাই বলল মিতুন একটু পরেই চলে আসবে। সেও যাবে ওদের সঙ্গে তার মাসীর বাড়ী। বেশ কিছুক্ষণ পরে মিতুন বাড়ী ফিরল। ফিরেই হই হই শুরু করে।
“ছোড়দা তুমি কি এনেছো আমার জন্য আমেরিকা থেকে”।
“ভেবেছিলাম একটা মেমবৌদি নিয়ে আসব তোর জন্য কিন্তু সবার চেঁচামেচিতে আর আনা হলনা”। অলক হাঁসতে হাঁসতে বলল।
“যাঃ ঠাট্টা করোনা”।
মিতুনের সঙ্গে বেশ খানিক্ষণ হাঁসি তামাসা করার পর অলক জিজ্ঞাসা করল মিতুনকে সে রিণি দাসগুপ্ত নামে কাউকে চেনে কিনা।
“ওমা! রিনি তো আমার স্কুলের বন্ধু, একক্লাসে পড়েছি। স্কুল থেকে পাশ করে বেরিয়ে ও গভর্নমে্নট কলেজে ঢুকল আর আমি কলকাতায় চলে গেলাম। তুমি ওকে কি করে চিনলে?”
“আজকে ট্রেনে আসতে আসতে আলাপ হলো, একই ট্রেনে আসলাম”।
“ও তোমার সঙ্গে কথা বলল? ওকে সবাই বলে ভীষণ অহঙ্কারী, কারোর সঙ্গে সহজে কথা বলেনা। তুমি আমেরিকা থেকে আসছ জেনে বোধহয় কথা বলেছে, অবশ্য আমি মনে করি ও স্বভাবতই লাজুক”।
“আমি ওকে একবারও আমেরিকার কথা বলিনি”।
এরপর মিতুন নিজেই রিণির উচ্ছসিত প্রশংসা করে গেল। অলককে কোনো প্রশ্নই করতে হলোনা রিনির সম্পর্কে। বিকেলবেলা সবাই মিলে সেজমামার শালীর মেয়েকে দেখতে গেল। ফেরবার পথে মামা জিজ্ঞেস করল, “কেমন দেখলি?” “ভালোই”, সক্ষিপ্ত উত্তর অলকের। মামী একটু ক্ষুব্ধ, কিন্তু কিছু বলল না, ভেবেছিলো অলক বোধহয় উচ্ছসিত প্রশংসা করবে বোনের মেয়েকে দেখে, অলক তার ধার কাছ দিয়েই গেলনা।
পরের দিন সকালের ট্রেনেই অলক কলকাতায় ফিরে গেল। বাড়ীতে পৌঁছেই সে ঘোষনা করল সেজমামার মেয়ে মিতুনের বন্ধু রিণি দাসগুপ্তকে সে বিয়ে করতে চায়। শুনে তো সবার মাথায় হাত। এ বলে কি? এত তোড়জোড় করে সব ভাল ভাল ফ্যামিলির বামুনের মেয়েদের দেখা হয়েছে আর এই ছেলে বলে কিনা অব্রাহ্মণের বাড়ীতে বিয়ে করবে? কিন্তু অলকের মা ঘাবড়ালেন না। অলকের বাবাকে বোঝালেন আজকাল কেউ জাত নিয়ে মাতামাতি করেনা। যদি একটা আমেরিকান মেয়ে বিয়ে করে নিয়ে আসত কি করতে তখন? অলকের মা আর সময় নষ্ট না করে আসানসোলে ফোন করলেন। মিতুনই ফোন ধরল, তার কাছ থেকে রিণির সমস্ত সংবাদ নিয়ে নিলেন তারপর বললেন, “তোর বাবাকে ফোনটা দে”। সুধীর ফোন ধরলে মা বললেন সব কথা এবং বললেন আজকেই যেন রিণির বাবার সঙ্গে কথা বলে সুধীর। সুধীর মিতুনের কাছ থেকে ব্যাপারটা আগেই জেনে গিয়েছিলেন।
সন্ধেবেলা খবর এল রিণির বাবা রাজী। ব্যাস অলকের বাড়ীতে সাজ সাজ রব পড়ে গেল। অতঃপর সেই মলমাস পৌষ মাসে অলক ট্রেনে প্রথম সাক্ষাতেই প্রেম ঘটে যাওয়া স্বল্পপরিচিতাকে বিয়ে করে বিদেশ পাড়ি দিল। আমেরিকাতে পৌঁছে রিণি অলককে জিজ্ঞেস করল, “তুমি কখন ঠিক করলে যে তুমি আমাকে বিয়ে করবে?” “যে মুহূর্তে তোমাকে দেখেছি সেই মুহূর্তে”। রিনি মুখ খোলার আগেই অলকের ঠোঁট রিণির ঠোঁটের ওপর চেপে বসে গেল।
Comments »
No comments yet.
RSS feed for comments on this post. TrackBack URL
Leave a comment